Thursday, 28 January 2021

 কত কথা তারে......

প্রতিদিন অনেক কথা বলি আমরা। অন্তহীন কথার স্রোত প্রবাহিত হয় আমাদের ঘিরে, যার পোশাকী নাম 'কমিউনিকেশন'। ওই টি ছাড়া এ যুগে কিচ্ছু টি হবার নয়। এর চাপে পড়ে অন্তর্মুখী মানুষের চিঁড়ে চ্যাপ্টা হবার দশা!
প্রতি মুহূর্তে কী ভাবছি, তা অন্য দের জানানো র প্রবল চাপ থাকে। না হ'লেই 'কমিউনিকেশন গ্যাপ'!
অতএব কথা চলতে থাকে। কথা চলতে থাকে কাজের জায়গায়, কথা চলতে থাকে অকাজের আড্ডা য়, কথা চলে পারিবারিক পরিমন্ডলে। নিজেদের দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ, বেদনা সব 'শেয়ার' করার কী ভীষণ তাড়নায় ছুটে চলেছে সবাই।
একজন মানুষ, রক্ত মাংস মেদ মজ্জা হাড় দিয়ে তৈরী একটি স্পর্শ যোগ্য অবয়ব মাত্র নয়। তাকে ঘিরে থাকে তার ভাবনা চিন্তা দিয়ে তৈরী এক বিমূর্ত বলয়। ইনফ্রারেড ইমেজিং করলে সাধারণ দৃষ্টি তে দৃশ্য মান নয় এমন , যে অবলোহিত তরঙ্গের অবয়ব ধরা পড়ে আমাদের চারপাশে, সেইরকম। সেই বিমূর্ত অবয়বটি খানিক অনুভববেদ্য বটে কিন্তু তাকে সম্পূর্ণ বুঝে ফেলা অসম্ভব। মানুষে মানুষে এত কথা চালাচালি, এত কমিউনিকেশন ওই বিমূর্ত স্তরে ই ঘটে। প্রতি দিন নতুন নতুন ভাবনার রাশি জমা হতে থাকে ওই অস্পর্শ যোগ্য স্তরে। প্রত্যেকটি মানুষ যেহেতু আলাদা, তাদের ভাবনার জগৎ ও তাই অনন্য। অনেক কথা বলা হয়ে গেলেও কমিউনিকেশন গ্যাপ তাই অবশ্যম্ভাবী।
আবার, অনেক সময় অনেক কথা বলার থাকলেও কিছুই বলে ওঠা হয়না। বলা যায় ও না হয়তো। অনেক সম্পর্কের উষ্ণতা ও মাধুর্য সেই সব না বলা কথাকে আশ্রয় করে ঘনিয়ে ওঠে। তাদের বলে ফেলতেও নেই। দামী সুগন্ধি র মত ঢাকা দিয়ে, দেরাজের অন্ধকারে রেখে দিলে ই তার স্থায়িত্ব বাড়ে। না বলা কথার গন্ধ বিধুর সমীরণ আমাদের জীবনের আনাচে কানাচ কে ভরিয়ে রাখে।

kobita

মুঠো খুলতেই ম্যাজিক!
ঝেঁপে এল বৃষ্টি আর জমা জলে লাফিয়ে লাফিয়ে হেঁটে যাওয়া লাল স্কার্ট সাদা জামা----
সাইকেল আরোহী কালো প্যান্ট ছেলের দল--- হৈ হৈ, হো হো-----
চেনা রাস্তার অচেনা আলোয় ধাঁধিয়ে যাওয়া চোখ কোমল হয়ে এল।
চোখ বুজতেই ম্যাজিক!
তেকোনা পার্ক, বাহারি পাঁচিল,
বিকেলের রোদ মেখে পাঁচিলে বসা দুই কিশোরীর আগডুম বাগডুম----
দোলাতে থাকা পা----
রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুটো একা বোকা লাল সাইকেল।
ফুচকার টক জল, ধনেপাতা, লঙ্কা কুচি
আহা, উস্ উস্, নাকের জল চোখের জল---
এক পৃথিবী গল্প শেষেও শেষ না হওয়া কথার ঝাঁপি গুটিয়ে রেখে
সাইকেল নিয়ে হুস্ ----
চোখ খুলতেই ম্যাজিক!
রুপোলি চুল, বলিরেখা, ঈষৎ মেদিনী
দুই কিশোরী অমন করেই হাসছে!
আর ঝনঝন করে ভেঙে পড়ছে তিরিশ বছরের পুরোনো কাচের দেওয়াল----
Image may contain: 2 people, glasses, close-up and indoor
Malay Kanti Dey, Ananjan Chatterjee and 216 others
57 comments
Like
Comment
Share

Monday, 4 May 2020

পাঠ প্রতিক্রিয়া - "Gun Island" by Amitav Ghosh


জীবনে অনেক সময় এমন অনেক ঘটনা বা ঘটনার সমারোহ একসঙ্গে ঘটে যার মধ্যে রহস্যময় কোন ইঙ্গিত লুকিয়ে থাকে বলে বোধহয়। পৃথিবী জোড়া মারী, রাস্তায় কাজ হারানো ছিন্নমূল শ্রমিকের ঢল, মানুষের উদাসীনতা বা অনন্যপূর্ব নিষ্ঠুরতার নগ্ন ছবি, তার সঙ্গে প্রকৃতির ঠান্ডা হয়ে আসা, দূষণ কমে যাওয়া গঙ্গার উজানে ডলফিন এর স্ফূর্তিময় লাফ,ফাঁকা রাস্তায় পাখিদের নির্ভয় কিচিরমিচির সবকিছু মিলে কোথাও যেন মনে হচ্ছিল এইসব ঘটনা এক মহাকাব্যিক বুননের অপেক্ষা রাখে । অক্ষর দিয়ে, শব্দ দিয়ে, গেঁথে তোলা প্রয়োজন এই সময়ের দলিল। এমন সময় কেমন যেন আনমনে তুলে নিয়েছিলাম অমিতাভ ঘোষের "গান আইল্যান্ড" বইটি । গত এক বছর ধরে সেটি আমার না পড়া বইয়ের তাকে এক কোণে চুপ করে অপেক্ষা করছিল সঠিক সময়ের, যখন কাজের আপাত ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে তার প্রতি সঠিক মনোযোগ দেওয়া যাবে।
যাঁরা ঘোষের বই এর সঙ্গে পরিচিত তাঁরা জানেন তাঁর বহু উপন্যাসের মূল চরিত্র হল সময় বা বহমান ইতিহাস। সেই বহমানতার অঙ্গ হিসেবে মানুষ আসে। কালের প্রায় মহাকাব্যিক প্রেক্ষাপটে মানুষ ও ঘটনার ধারা বয়ে চলে। ঢাকা, কলকাতা, শ্রীলংকা ও নিউ ইয়র্কে তাঁর জীবনের বিভিন্ন সময় কেটেছে বা কাটে, হয়তো সেইজন্যই তার লেখালেখির মধ্যে বারবার ঘুরে ফিরে আসে পরিযায়ী মানুষের দেশ থেকে দেশান্তরে যাওয়া, অবর্ণনীয় রকমের কঠিন জীবন সংগ্রাম ও থিতু হওয়ার কাহিনী।
এই বইটি হাংরি টাইড এর পরবর্তী পাঠ বা সিক্যুয়েল বলা যেতে পারে। সুন্দর বন, নীলিমা বোস ও তার বাদাবন ট্রাস্ট, মেরিন বায়োলজিস্ট পিয়া এদের সঙ্গে নিয়ে কাহিনীর জাল বিছাতে থাকে। তার সঙ্গে কাহিনীর মূল কথক, প্রাচীন ও দুষ্প্রাপ্য বইয়ের ডিলার ব্রুকলিন নিবাসী দীননাথ দত্তের সংযোগ সূত্র ধরে গল্প এগোয়। সেইসঙ্গে জুড়ে যায় এক প্রাচীন লোকসাহিত্যের নায়ক বন্দুক ই সদাগর আর এই দুটি পংক্তি
"কলকাতায় তখন না ছিল লোক, না মকান
বাংলার পাটনি তখন নগর এ জাহান"
মেরিন বায়োলজিস্ট পিয়া আমেরিকা প্রবাসী, সুন্দরবন অঞ্চলে ইরাবড্ডি ডলফিন বা অর্কায়েলা ব্রেভিরসট্রিস এর বসতি ও মাইগ্রেশন এর ধরন খুঁজে বের করা তার কাজ। এই কাজে তার সঙ্গী স্হানীয় মানুষ জন। আয়লার সময় থেকে সুন্দরবনের জমি র চরিত্র বদলে যেতে থাকে, বদলে যেতে থাকে জল- জঙ্গল- মানুষের সমীকরণ। হিউম্যান মাইগ্রেশন ঘটতে থাকে বিপুল হারে। সুন্দরবন " Where the war between profit and nature is fought ", তার রহস্যময় বাদাবন, পিয়ার পালিত পরিবারের সন্তান টিপু, এক নির্জন দ্বীপে বন্দুকি সদাগরের টেরাকোটা মন্দির, মন্দিরের গায়ে টেরাকোটা ফলকে আঁকা রহস্যময় চিহ্ন ও মূর্তি, বিষাক্ত কেউটে সাপ ও তার কামড় সব নিয়ে প্রায় ভীতিজনক এবং শহুরে জীবন যাপনে অভ্যস্ত দীননাথের সম্পূর্ণ অজানা এক জগৎ তার বিশাল পাখা বিস্তার করতে থাকে এই একবিংশ শতকের পৃথিবীতে যেখানে মিথ আর বাস্তব এক হয়ে যেতে থাকে।
মিথ আসলে কী? তা কি কোনো দিন বাস্তব ছিল? আমাদের সমষ্টিগত চেতনায় বা অবচেতনে সে কি বেঁচে থাকে? বেঁচে থাকে কোনো এক বিশেষ সময়ের অপেক্ষায় যেখানে সে রহস্যের পর্দা সরিয়ে বাস্তব হয়ে ওঠে?
বন্দুকি সদাগরের কাহিনী মুখে মুখে গাওয়া হত, মনসামঙ্গলের মতোই, লেখার অনুমতি ছিল না। বংশ পরম্পরায় কোনো একটি মুসলমান জেলে পরিবার সেই ধারাকে রক্ষা করে এসেছে। তাদের শেষতম বংশধর রফি। সে এই গান শুনেছে তার দাদু ও মায়ের মুখে। কিন্তু তার কাছে বন্দুক দ্বীপ, শিকল দ্বীপ, রুমালি দেশ এসব নিছকই রূপকথার গল্পের মতো।
আশ্চর্যের বিষয় হল মনসামঙ্গল ও চাঁদ সদাগরের বাণিজ্য যাত্রা যখন লেখা হচ্ছে বা বন্দুকি সদাগরের কাহিনীর যে সময় দীননাথ আবিষ্কার করে, সেই সপ্তদশ শতক অন্য একটি কারণেও পৃথিবীর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। মঙ্গলকাব্যের কাল পর্যায় ভাবা হয় তেরোশো থেকে ষোলো শো সাল বা তারপরের সময়, সেই সময় পৃথিবীতে এসেছিল লিটিল আইস এজ। গোটা ইউরোপ জুড়ে তখন বন্যা দাবানল ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয় চলছে, আবার সেই সময় ঘটছে শিল্প বিপ্লব, রেনেসাঁ , ডেকার্টে, গ্যালিলিও, নিউটনের হাত ধরে বিজ্ঞানের জয়গান। সেই সময়ই ইংল্যান্ডে প্রথম কয়লা পুড়িয়ে ঘর গরম রাখা শুরু হয়। মনে করা হয় যে লিটল আইস এজের সঙ্গে সৌর ঝঞ্ঝার সম্পর্ক আছে । গ্র্যান্ড সোলার মিনিমাম ঘটেছিল 1650 থেকে 1715 র মধ্যে । কারো কারো মতে 2019 থেকে আবারো সেই রকম কিছু ঘটতে চলেছে।
বৈজ্ঞানিক কারণ যাই হোক সেই সময়ও মানুষ সমুদ্র বানিজ্যে যেত ,সর্প দেবীর অভিশাপে সর্বস্ব হারাতো, দেশ দেশান্তরে ঘুরে বেড়াতো অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে, আবার দেবীর সঙ্গে সন্ধি করে ফিরে পেত হারানো গৌরব। একি আসলে প্রকৃতির শক্তির সঙ্গে ,অন্যান্য জীবন্ত প্রাণীর সঙ্গে সম্মানজনক সহাবস্থানের বিনিময়ে হৃতগৌরব ফিরে পাওয়া!
ভেনিস নিবাসী ইতালিয়ান ঐতিহাসিক, সারা জীবন যিনি ভেনিসের ইতিহাস, প্রাচীন মিথ ও কাল্ট নিয়ে গবেষণা করেছেন, সেই প্রফেসরেসা জিয়া সিন্তা শিয়াভো,এই কাহিনীর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। দীননাথের সঙ্গে তাঁর অকৃত্রিম সখ্য। কাহিনী র বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটমান বর্তমান ও মিথের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে দেবার কাজ টি তিনি করেছেন।
দীননাথের জীবনে নানা আকস্মিক ঘটনা ঘটতে থাকে। তাপমাত্রা বেড়ে যাবার কারণে গভীর সমুদ্র থেকে তীরের দিকে ভেসে আসে অতি বিষাক্ত সামুদ্রিক সাপ, ভেনিসের অ্যাপার্টমেন্টে দেখা দেয় প্রাণঘাতী মাকড়সা। রাস্তার ধারে এক দুর্ঘটনায় প্রাণ সংশয়ের উপক্রম হয় আর সেখানে দেখা হয় বন্দুকি সদাগরের স্মৃতি সৌধের শেষ উত্তরাধিকারী রফি র। পথে ঘাটে অজস্র বাংলাদেশী শ্রমিকের সঙ্গে দেখা হতে থাকে তার এবং ক্রমশঃ সে তাদের জীবন ও জীবিকার নানা দাবি দাওয়ার সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়তে থাকে। জীবনের রাশ যেন তার হাত থেকে বেরিয়ে যাবার উপক্রম হয়। সিন্তা শিয়াভো তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে দিনো কে বারবার জীবনে ফিরিয়ে আনেন। ভেনিসের রাস্তা য় তাঁরা বন্দুকিসদাগরের পদচিহ্ন খুঁজে বেড়ান আর অতীত ক্রমে মিশে যেতে থাকে বর্তমানে।
'Sometimes I ask myself', she said, 'what would happen if those great Venetian travellers, the Polos, Niccolo de Conti, Ambrosio Bembo----- were to come back to the Venice today? Who would they have more in common with? US twenty first century Italians who rely on immigrants to do all our dirty works? The tourists who come in luxury liners or aeroplanes? Or these 'ragazzi migranti' who take their hands to cross the sea just like all those great Venetian travelers of the past?
ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা র মূল স্তম্ভ ছিল দাস ব্যবসা। তার হাত ধরে আসে প্লেগের উপদ্রব।
In 1629,German soldiers brought the plague to Milan and within weeks tens of thousands were dead.
Disease was not new to Venice and you could even say that modern sanitary protocols, for dealing with epidemics, we're invented in Venice. So when the great plague of 1630 broke out, the city fathers were not slow to act. Quarantine and curfews were put into place;all who were suspected of infection, were transported to a quarantined island. All public places were closed and people were forbidden to leave their houses. Only soldiers could move about freely. Specially appointed Marshalls, whose faces were covered with beaked masks, would go from house to house fumigating and checking for the signs of disease.
মনে হতে পারে আজকের ইতালির ছবি দেখছি বুঝি।
এইসবের মধ্যে ভূমধ্যসাগরে ভেসে আসে একটি নীল রঙের নৌকা। তাকে ঘিরে সরগরম হয়ে ওঠে রাজনীতি। যে ইউরোপীয় রা দেশে দেশে দাস চালানের ব্যবসা করেছে, ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি র যা ছিল মূল কারণ,বহু দেশের জন বিন্যাস পাকাপাকিভাবে বদলে গেছিল যার ফলে, সেই ইউরোপীয় রা তাদের দেশে অন্য কাউকে জায়গা দিতে রাজি নয়। কিন্তু আজও চলেছে দেশ থেকে দেশান্তরে মানুষের অন্তহীন যাতায়াত দালাল চক্রের হাত ধরে। উন্নত বিশ্বের সুযোগ সুবিধা র লোভে, নিজের দেশের রাজনৈতিক সামাজিক পরিস্থিতি র থেকে বেরিয়ে একটু ভালো ভাবে বাঁচার আশায় মানুষ আজও পাচার হচ্ছে এক মহাদেশ থেকে অন্যত্র।
Return to sender
No room here, go home
Climate migration= invasion
We are the indigenous the only owner s of the continent
Send them back with birth control
ছোট্ট নীল নৌকাটিকে ঘিরে ঘনিয়ে ওঠে ঘটনার জাল। বন্দুকি সদাগরের গল্প এখানে ও সত্যি হয়ে ওঠে। "it's just as it says in the story---- the creatures of the sky and sea rising up...... "
কী হল জানতে বই টি পড়তে হবে।
এটি ও আমার বারবার পড়ার মতো বইয়ের তালিকায় যুক্ত হল।


Monday, 17 June 2019

যখন ছোট ছিলাম, মনে হত মা বুঝি ভালোই বাসেন না। কখনও জড়িয়ে ধরে আদর করেছেন এমন স্মৃতি নেই। আমার সাধারণ সরকারি চাকুরে বাবার সংসারে, গৃহ সহায়তাকারী র সাহায্য ছাড়া মা সকাল থেকে রাত কাজে ব্যস্ত থাকতেন। তার ফাঁকে আমাকে আর ভাইকে পড়াতেন, অসুস্থ বাবার সেবা করতেন আর একটু অবসর পেলে নাকে চশমা এঁটে গল্পের বই। আমি খুব বাবার ভক্ত ছিলাম। বাবা তুমুল ভালোবাসতেন, দশপাতা হাতের লেখা না হলে লাঠির বাড়ি দিতেন, মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে কে. সি. নাগের না করতে পারা অঙ্ক কষাতেন, আবার সুস্থ থাকলে নেচে ও নিতেন। মা, তুলনায় ভীষণ চাপা, প্রচ্ছন্ন। বাবার অতি শাসন থেকে কখন ও বাঁচাতে ও আসতেন না। সেই ছোট্ট বেলা থেকে আমায় নিজের জামা নিজে ধুতে হত। কত ছোট? সাত, আট বছর হবে। মা কে খুব কড়া, হৃদয় হীন মনে হত।
বাবার ছিল দুরারোগ্য হাঁপানি। তখন ইনহেলার ইত্যাদি ছিল না। বাবা শুতে পারতেন না, মা পাশে বসে থাকতেন। বাবা হাসপাতালে, মা ও সঙ্গে। আমাদের সংসার কী ভাবে চলেছে কখনও ভাবিনি। মা র শরীর চলছে কি না সে বোধ ও ছিল না। আমরা দুবেলা রাঁধা ভাত পেয়েছি, ইস্কুল গেছি, লেখাপড়া করেছি। মা র কোনও দামী শাড়ি টাড়িও ছিল না। কোনও দিন গয়না গড়াতে দেখিনি। আমাদের পরিবারে অজস্র আত্মীয় স্বজনের যাওয়া আসা লেগেই থাকত। আমাদের বেশ মজাই হত। মা'র কথা অত ভাবনাতেই আসত না।
মা গান গাইতেন। অসাধারণ সুরেলা গলা। রেডিও তে শুনে শুনে তোলা। কোনও দিন বলিনি মা গান শোনাও।
আমার বাবা বলতেন "তোর মা আমার মর্ত্যে র ভগবান"।
বাড়ি র কাজ আমাকে আর ভাইকে সমান ভাবে করতে হত। খাবার সময় দুধের সর আর চাঁচি খাওয়া নিয়ে মারামারি বন্ধ করার জন্য পালা হয়েছিল। একদিন ভাই সর আমি চাঁচি, অন্য দিন উল্টো। বিছানা করা, মশারি টাঙানো সবের পালা পড়ত।
আমার ভয়ঙ্কর অসুস্থ বাবার দেখাশোনা তার উত্তুঙ্গ মেজাজ সামলানো মা অবিচল হয়ে করতেন। আমার পিসিরা বাবাকে বকতেন মেজাজ খারাপ করার জন্য। মা বলতেন রোগের জ্বালায় ও এমন করে। আমি ও যদি রেগে যাই, ও মানুষটা কোথায় যাবে?
মা'র যখন সাতচল্লিশ, বাবা মারা যান।
আমার মা এখন আটষট্টি। একা থাকেন। এখনও একাই লাইটের বাল্ব বদলান, ফিউজ লাগান। একা একা দাঁত তুলে চলে আসেন। আমার বা ছেলের জ্বরজ্বালা হলে দেখতে আসেন। ব ই পড়েন, শাড়ি তে অ্যাক্রিলিক রঙ দিয়ে ফুল পাতা আঁকেন, বোনের স্কার্ট দিয়ে বাহারি ব্যাগ বানিয়ে ব্যবহার করেন।
আমার প্রচ্ছন্ন থাকা মা ,দরকারে ভীষণ কঠিন কথা বলতে পারা মা, আমার ভাইয়ের ব উ এর 'ভালো মা', নন ইন্টারফিয়ারিং মা তাঁকে আমি এখন বুঝতে পারি।
"যখন বৃক্ষরাজি র ভিতর দিয়ে বহে যাবে সমুষ্ণ বাতাস,
নদীর উপর ছায়া ফেলবে গোধূলি কালীন মেঘ
পুষ্পরেণু ভেসে আসবে বাতাসে
আর পালতোলা নৌকা ভেসে যাবে বিক্ষিপ্ত স্রোতোধারায়...
সহসা অবলুপ্ত দৃষ্টি ফিরে পেয়ে তুমি দেখবে---
আমার কেশ পাশে বিজড়িত রয়েছে অস্থি নির্মিত মালা:
তখন---কেবল তখনই আমি তোমার কাছে আসব"
'নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা' বই টি আবর্তিত হয়েছে এই শ্লোক টিকে ঘিরে।
অমিতায়ুধ, আর্কিওলজি র ছাত্র, গবেষক। তার হাতে এসে পড়ে একটি চন্দন কাঠের বাক্স, যার ভিতরে রয়েছে একটি বৌদ্ধ তারাদেবী র মূর্তি, একটি জপমালা ও একটি পুথি। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া কে বাক্সটি পাঠিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেটি পাওয়া গেছে ঢাকা বিক্রমপুর অঞ্চল থেকে। পুথির কাল নির্ণয় নিয়ে সমস্যা। তার ভাষা ও বিষয় বৈচিত্র্য অদ্ভুত! খানিক তিব্বতী ও খানিক গৌড়ী রীতির সংস্কৃতে লেখা পুথিটিতে রয়েছে প্রজ্ঞা পারমিতা সাহস্রিকা, বৌদ্ধ তন্ত্রের দেবী তারার মহিমা সূচক স্তোত্র, ছাত্র পাঠ্য ব্যাকরণের সূত্র আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় ব্যয় ও প্রশাসনিক সমস্যা র উপর খসড়া টিপ্পনী। আবার তার মধ্যে পালবংশের দুই খ্যাতি মান সম্রাট মহীপাল ও নয় পালের সঙ্গে রাষ্ট্রকূট বংশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক কৌশল আলোচিত হয়েছে।
এই বিচিত্র পুথি টির সম্পর্কে অনুসন্ধান সূত্রে উপন্যাস টি তার জাল বিস্তার করে।
উপন্যাস টিতে অনেক চরিত্র কিন্তু সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বোধকরি 'সময়'। তিনটি পৃথক সময় কল্পে উপন্যাস টির বিস্তার---দশম ও একাদশ শতক, ত্রয়োদশ শতক ও একবিংশ শতক। লেখক যে বিশিষ্ট শৈলী এখানে অবলম্বন করেছেন তাতে সময় গুলি পৃথক পৃথক অস্তিত্ব নিয়ে বর্তমান নয়, বরং তারা অনায়াসে একে অপরকে ছেদ করে। অতীত প্রবিষ্ট হয় ভবিষ্যতে, আবার বর্তমান বিনা বাধায় প্রবেশ করে অতীতে।
এই জাদু বাস্তবতা এবং অতীত- বর্তমান- ভবিষ্যতে র ছেদ বিন্দু দিয়ে তিনটি সময় বৃত্তে স্বচ্ছন্দ অনায়াস বিচরণ ই হল এই উপন্যাসের সবথেকে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য।
ইতিহাসে র এক বিস্মৃত-প্রায় অধ্যায় ও এক বিস্মৃতির অন্তরালে থাকা মানুষ অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জীবনের পথ পরিক্রমা আলোচিত হয়েছে এখানে।
দশম ও একাদশ শতকের বৌদ্ধ ভারত; ওদন্তপুরী, বিক্রম শীল আরও অসংখ্য বৌদ্ধবিহার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আকীর্ণ তর্কশীল ভারত, যাকে আমরা ভুলে গেছি---- সেই কালপর্বে রাজপুত্র চন্দ্রগর্ভ ক্রমশঃ হয়ে উঠলেন দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। ---"আমি কে? " এই চিরন্তন অনুসন্ধিৎসা মানুষ কে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে আবহমান কাল ধরে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয় নিজের সমাজ, প্রতিবেশ, মানুষ সবকিছু র মধ্যে থেকে। রাজপুত্র চন্দ্রগর্ভ ও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ছিলেন। বিশেষ পরিস্থিতি তে তিনি পারিবারিক তন্ত্র সাধনার পথ পরিত্যাগ করে শ্রামণ্য গ্রহণ করেন আর তাঁর সমগ্র জীবনব্যাপী পথচলা র বিভিন্ন পর্বে ওই কূটাভাস টির অর্থ তাঁর কাছে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চন্দ্রগর্ভ হয়ে ওঠেন মহাকারুণিক দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। তাঁর যুক্তি ও তর্কশীলতায় তিনি তৎকালীন সমাজের ধর্মীয় রীতি কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে নাস্তিক আখ্যা পান। পাঠকের অবশ্যই এখানে মনে পড়বে ঊনবিংশ শতকের আর এক মহাকারুণিক ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কথা।
এই উপন্যাসের আর একটি কালপর্বে, ত্রয়োদশ শতকে, অতীশের সন্ধানে তিব্বত থেকে ভারতে আসেন ভিক্ষু চাগ লোচাবা। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় তখন বহিঃশত্রুর আক্রমণে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। অতীশের জন্ম স্থান তখন পরিত্যক্ত ঢিপি। সেখানে চাগ যে বাড়িতে আশ্রয় পান, তার কর্ত্রী বজ্র ডাকিনী স্বয়ংবিদার চুম্বনে তিনি প্রবিষ্ট হন অতীশের সময় পর্বে, একাদশ শতাব্দীতে! এ যেন সেই আপেক্ষিকতা বাদ প্রসূত ওয়র্ম হোল, যার মধ্যে দিয়ে দেশ কালের এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দু তে যাতায়াত করা যায়!
এই উপন্যাসের অনেক কিছু ই রূপকথার মত। বৌদ্ধ গয়া র এক অরণ্য মধ্যবর্তী পর্ণ কুটিরে সময়ের তিনটি বৃত্ত এক জায়গায় ছেদ করে। অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতে র মিলন ঘটে!
ভাষা এই উপন্যাসের আর একটি বৈশিষ্ট্য। তিনটি ভিন্ন কালপর্বে তিনটি ভিন্ন ভাষা শৈলী ব্যবহৃত হয়েছে। অসামান্য ঝংকার ময়, তৎসমবহুল সাধু গদ্য রীতি পড়তে গিয়ে গায়ে কাঁটা দেয়।
বর্তমান কালপর্বে লেখক নিজেও উপন্যাসের একটি চরিত্র। তিনি ও অতীশেকে খুঁজছেন, লিখছেন, ছিঁড়ছেন, ক্লান্ত হচ্ছেন। অবশেষে একসময় চরিত্র গুলি জীবন্ত হয়ে উঠে তাঁর কলম দিয়ে শব্দ রূপ ধারণ করে মূর্ত হয়ে উঠতে থাকে।
"চাগ লোচাবা সম্মুখে তাকালেন। অন্ধকারে স্তম্ভিত বৃক্ষ টি কে, সেই টিলাটিকে, পরিত্যক্ত প্রাসাদ টি কে দেখতে দেখতে তাঁর এক অদ্ভুত কথা মনে হ'ল। মনে হ'ল, এখন এই যা তিনি দর্শন করছেন, এও কোনো স্বপ্ন নয়তো?....... সম্মুখে বেতসকুঞ্জের দিকে নিরীক্ষণ করলেন, মনে হল এর পত্র শাখা কান্ড সব বর্ণমালা দ্বারা নির্মিত। সম্মুখে নিগূঢ় পন্থা, তার প্রতি টি ধূলিকণা যেন শব্দ দিয়ে গাঁথা!...... তবে তিনি নিজেও কি অক্ষর নির্মিত, শব্দ দ্বারা গঠিত?..... কে সে রচয়িতা?
যেন তাকে দেখবার জন্য ই চাগ লোচাবা গ্রীবা আবর্তিত ক'রে পশ্চাতে ফিরে তাকালেন।
আর তখনই, হে ইতিহাস ধূসর পর্যটক চাগ লোচাবা! আপনি দেখতে পেলেন "আমাকে"..... এ সমস্ত দৃশ্য ,ঘটনা ও চরিত্র সমূহের পশ্চাতে যুগান্ত যাপী এই কাহিনী র প্রায়োন্মাদ কথাকার আমি..... যে আমি সম্প্রতি নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা লিখে চলেছি!
আপনি আমার নাম পরিচয় কিছু ই জানেন না। আমি আপনার থেকে বহু কাল দূরবর্তী।
চোরাবালিতে অসহায় পথিক পতিত হলে যেমন ক্রমে ক্রমে আপাদমস্তক ডুবে যায়, সাদা পাতার ভিতর আপনি----চাগ লোচাবা, আপনি ও তেমনই ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে গেলেন।তৎস্থলে লেখা র খাতায় অন্যবিধ শব্দ মালা ফেনময় সমুদ্রের বুকে কৃষ্ণ মীনের ন্যায় ফুটে উঠতে লাগল"
.........................................................
মহাযান বৌদ্ধ মতে প্রত্যেকে বুদ্ধত্ব অর্জনের অধিকারী। এই অস্থির সময়ে সেই মহাকারুণিক কে আবার নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল এই বইটি।
নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা
লেখক:সন্মাত্রানন্দ
প্রকাশনা:ধানসিড়ি