Monday, 17 June 2019

যখন ছোট ছিলাম, মনে হত মা বুঝি ভালোই বাসেন না। কখনও জড়িয়ে ধরে আদর করেছেন এমন স্মৃতি নেই। আমার সাধারণ সরকারি চাকুরে বাবার সংসারে, গৃহ সহায়তাকারী র সাহায্য ছাড়া মা সকাল থেকে রাত কাজে ব্যস্ত থাকতেন। তার ফাঁকে আমাকে আর ভাইকে পড়াতেন, অসুস্থ বাবার সেবা করতেন আর একটু অবসর পেলে নাকে চশমা এঁটে গল্পের বই। আমি খুব বাবার ভক্ত ছিলাম। বাবা তুমুল ভালোবাসতেন, দশপাতা হাতের লেখা না হলে লাঠির বাড়ি দিতেন, মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে কে. সি. নাগের না করতে পারা অঙ্ক কষাতেন, আবার সুস্থ থাকলে নেচে ও নিতেন। মা, তুলনায় ভীষণ চাপা, প্রচ্ছন্ন। বাবার অতি শাসন থেকে কখন ও বাঁচাতে ও আসতেন না। সেই ছোট্ট বেলা থেকে আমায় নিজের জামা নিজে ধুতে হত। কত ছোট? সাত, আট বছর হবে। মা কে খুব কড়া, হৃদয় হীন মনে হত।
বাবার ছিল দুরারোগ্য হাঁপানি। তখন ইনহেলার ইত্যাদি ছিল না। বাবা শুতে পারতেন না, মা পাশে বসে থাকতেন। বাবা হাসপাতালে, মা ও সঙ্গে। আমাদের সংসার কী ভাবে চলেছে কখনও ভাবিনি। মা র শরীর চলছে কি না সে বোধ ও ছিল না। আমরা দুবেলা রাঁধা ভাত পেয়েছি, ইস্কুল গেছি, লেখাপড়া করেছি। মা র কোনও দামী শাড়ি টাড়িও ছিল না। কোনও দিন গয়না গড়াতে দেখিনি। আমাদের পরিবারে অজস্র আত্মীয় স্বজনের যাওয়া আসা লেগেই থাকত। আমাদের বেশ মজাই হত। মা'র কথা অত ভাবনাতেই আসত না।
মা গান গাইতেন। অসাধারণ সুরেলা গলা। রেডিও তে শুনে শুনে তোলা। কোনও দিন বলিনি মা গান শোনাও।
আমার বাবা বলতেন "তোর মা আমার মর্ত্যে র ভগবান"।
বাড়ি র কাজ আমাকে আর ভাইকে সমান ভাবে করতে হত। খাবার সময় দুধের সর আর চাঁচি খাওয়া নিয়ে মারামারি বন্ধ করার জন্য পালা হয়েছিল। একদিন ভাই সর আমি চাঁচি, অন্য দিন উল্টো। বিছানা করা, মশারি টাঙানো সবের পালা পড়ত।
আমার ভয়ঙ্কর অসুস্থ বাবার দেখাশোনা তার উত্তুঙ্গ মেজাজ সামলানো মা অবিচল হয়ে করতেন। আমার পিসিরা বাবাকে বকতেন মেজাজ খারাপ করার জন্য। মা বলতেন রোগের জ্বালায় ও এমন করে। আমি ও যদি রেগে যাই, ও মানুষটা কোথায় যাবে?
মা'র যখন সাতচল্লিশ, বাবা মারা যান।
আমার মা এখন আটষট্টি। একা থাকেন। এখনও একাই লাইটের বাল্ব বদলান, ফিউজ লাগান। একা একা দাঁত তুলে চলে আসেন। আমার বা ছেলের জ্বরজ্বালা হলে দেখতে আসেন। ব ই পড়েন, শাড়ি তে অ্যাক্রিলিক রঙ দিয়ে ফুল পাতা আঁকেন, বোনের স্কার্ট দিয়ে বাহারি ব্যাগ বানিয়ে ব্যবহার করেন।
আমার প্রচ্ছন্ন থাকা মা ,দরকারে ভীষণ কঠিন কথা বলতে পারা মা, আমার ভাইয়ের ব উ এর 'ভালো মা', নন ইন্টারফিয়ারিং মা তাঁকে আমি এখন বুঝতে পারি।
"যখন বৃক্ষরাজি র ভিতর দিয়ে বহে যাবে সমুষ্ণ বাতাস,
নদীর উপর ছায়া ফেলবে গোধূলি কালীন মেঘ
পুষ্পরেণু ভেসে আসবে বাতাসে
আর পালতোলা নৌকা ভেসে যাবে বিক্ষিপ্ত স্রোতোধারায়...
সহসা অবলুপ্ত দৃষ্টি ফিরে পেয়ে তুমি দেখবে---
আমার কেশ পাশে বিজড়িত রয়েছে অস্থি নির্মিত মালা:
তখন---কেবল তখনই আমি তোমার কাছে আসব"
'নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা' বই টি আবর্তিত হয়েছে এই শ্লোক টিকে ঘিরে।
অমিতায়ুধ, আর্কিওলজি র ছাত্র, গবেষক। তার হাতে এসে পড়ে একটি চন্দন কাঠের বাক্স, যার ভিতরে রয়েছে একটি বৌদ্ধ তারাদেবী র মূর্তি, একটি জপমালা ও একটি পুথি। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া কে বাক্সটি পাঠিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেটি পাওয়া গেছে ঢাকা বিক্রমপুর অঞ্চল থেকে। পুথির কাল নির্ণয় নিয়ে সমস্যা। তার ভাষা ও বিষয় বৈচিত্র্য অদ্ভুত! খানিক তিব্বতী ও খানিক গৌড়ী রীতির সংস্কৃতে লেখা পুথিটিতে রয়েছে প্রজ্ঞা পারমিতা সাহস্রিকা, বৌদ্ধ তন্ত্রের দেবী তারার মহিমা সূচক স্তোত্র, ছাত্র পাঠ্য ব্যাকরণের সূত্র আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় ব্যয় ও প্রশাসনিক সমস্যা র উপর খসড়া টিপ্পনী। আবার তার মধ্যে পালবংশের দুই খ্যাতি মান সম্রাট মহীপাল ও নয় পালের সঙ্গে রাষ্ট্রকূট বংশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক কৌশল আলোচিত হয়েছে।
এই বিচিত্র পুথি টির সম্পর্কে অনুসন্ধান সূত্রে উপন্যাস টি তার জাল বিস্তার করে।
উপন্যাস টিতে অনেক চরিত্র কিন্তু সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বোধকরি 'সময়'। তিনটি পৃথক সময় কল্পে উপন্যাস টির বিস্তার---দশম ও একাদশ শতক, ত্রয়োদশ শতক ও একবিংশ শতক। লেখক যে বিশিষ্ট শৈলী এখানে অবলম্বন করেছেন তাতে সময় গুলি পৃথক পৃথক অস্তিত্ব নিয়ে বর্তমান নয়, বরং তারা অনায়াসে একে অপরকে ছেদ করে। অতীত প্রবিষ্ট হয় ভবিষ্যতে, আবার বর্তমান বিনা বাধায় প্রবেশ করে অতীতে।
এই জাদু বাস্তবতা এবং অতীত- বর্তমান- ভবিষ্যতে র ছেদ বিন্দু দিয়ে তিনটি সময় বৃত্তে স্বচ্ছন্দ অনায়াস বিচরণ ই হল এই উপন্যাসের সবথেকে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য।
ইতিহাসে র এক বিস্মৃত-প্রায় অধ্যায় ও এক বিস্মৃতির অন্তরালে থাকা মানুষ অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জীবনের পথ পরিক্রমা আলোচিত হয়েছে এখানে।
দশম ও একাদশ শতকের বৌদ্ধ ভারত; ওদন্তপুরী, বিক্রম শীল আরও অসংখ্য বৌদ্ধবিহার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আকীর্ণ তর্কশীল ভারত, যাকে আমরা ভুলে গেছি---- সেই কালপর্বে রাজপুত্র চন্দ্রগর্ভ ক্রমশঃ হয়ে উঠলেন দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। ---"আমি কে? " এই চিরন্তন অনুসন্ধিৎসা মানুষ কে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে আবহমান কাল ধরে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয় নিজের সমাজ, প্রতিবেশ, মানুষ সবকিছু র মধ্যে থেকে। রাজপুত্র চন্দ্রগর্ভ ও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ছিলেন। বিশেষ পরিস্থিতি তে তিনি পারিবারিক তন্ত্র সাধনার পথ পরিত্যাগ করে শ্রামণ্য গ্রহণ করেন আর তাঁর সমগ্র জীবনব্যাপী পথচলা র বিভিন্ন পর্বে ওই কূটাভাস টির অর্থ তাঁর কাছে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চন্দ্রগর্ভ হয়ে ওঠেন মহাকারুণিক দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। তাঁর যুক্তি ও তর্কশীলতায় তিনি তৎকালীন সমাজের ধর্মীয় রীতি কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে নাস্তিক আখ্যা পান। পাঠকের অবশ্যই এখানে মনে পড়বে ঊনবিংশ শতকের আর এক মহাকারুণিক ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কথা।
এই উপন্যাসের আর একটি কালপর্বে, ত্রয়োদশ শতকে, অতীশের সন্ধানে তিব্বত থেকে ভারতে আসেন ভিক্ষু চাগ লোচাবা। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় তখন বহিঃশত্রুর আক্রমণে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। অতীশের জন্ম স্থান তখন পরিত্যক্ত ঢিপি। সেখানে চাগ যে বাড়িতে আশ্রয় পান, তার কর্ত্রী বজ্র ডাকিনী স্বয়ংবিদার চুম্বনে তিনি প্রবিষ্ট হন অতীশের সময় পর্বে, একাদশ শতাব্দীতে! এ যেন সেই আপেক্ষিকতা বাদ প্রসূত ওয়র্ম হোল, যার মধ্যে দিয়ে দেশ কালের এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দু তে যাতায়াত করা যায়!
এই উপন্যাসের অনেক কিছু ই রূপকথার মত। বৌদ্ধ গয়া র এক অরণ্য মধ্যবর্তী পর্ণ কুটিরে সময়ের তিনটি বৃত্ত এক জায়গায় ছেদ করে। অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতে র মিলন ঘটে!
ভাষা এই উপন্যাসের আর একটি বৈশিষ্ট্য। তিনটি ভিন্ন কালপর্বে তিনটি ভিন্ন ভাষা শৈলী ব্যবহৃত হয়েছে। অসামান্য ঝংকার ময়, তৎসমবহুল সাধু গদ্য রীতি পড়তে গিয়ে গায়ে কাঁটা দেয়।
বর্তমান কালপর্বে লেখক নিজেও উপন্যাসের একটি চরিত্র। তিনি ও অতীশেকে খুঁজছেন, লিখছেন, ছিঁড়ছেন, ক্লান্ত হচ্ছেন। অবশেষে একসময় চরিত্র গুলি জীবন্ত হয়ে উঠে তাঁর কলম দিয়ে শব্দ রূপ ধারণ করে মূর্ত হয়ে উঠতে থাকে।
"চাগ লোচাবা সম্মুখে তাকালেন। অন্ধকারে স্তম্ভিত বৃক্ষ টি কে, সেই টিলাটিকে, পরিত্যক্ত প্রাসাদ টি কে দেখতে দেখতে তাঁর এক অদ্ভুত কথা মনে হ'ল। মনে হ'ল, এখন এই যা তিনি দর্শন করছেন, এও কোনো স্বপ্ন নয়তো?....... সম্মুখে বেতসকুঞ্জের দিকে নিরীক্ষণ করলেন, মনে হল এর পত্র শাখা কান্ড সব বর্ণমালা দ্বারা নির্মিত। সম্মুখে নিগূঢ় পন্থা, তার প্রতি টি ধূলিকণা যেন শব্দ দিয়ে গাঁথা!...... তবে তিনি নিজেও কি অক্ষর নির্মিত, শব্দ দ্বারা গঠিত?..... কে সে রচয়িতা?
যেন তাকে দেখবার জন্য ই চাগ লোচাবা গ্রীবা আবর্তিত ক'রে পশ্চাতে ফিরে তাকালেন।
আর তখনই, হে ইতিহাস ধূসর পর্যটক চাগ লোচাবা! আপনি দেখতে পেলেন "আমাকে"..... এ সমস্ত দৃশ্য ,ঘটনা ও চরিত্র সমূহের পশ্চাতে যুগান্ত যাপী এই কাহিনী র প্রায়োন্মাদ কথাকার আমি..... যে আমি সম্প্রতি নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা লিখে চলেছি!
আপনি আমার নাম পরিচয় কিছু ই জানেন না। আমি আপনার থেকে বহু কাল দূরবর্তী।
চোরাবালিতে অসহায় পথিক পতিত হলে যেমন ক্রমে ক্রমে আপাদমস্তক ডুবে যায়, সাদা পাতার ভিতর আপনি----চাগ লোচাবা, আপনি ও তেমনই ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে গেলেন।তৎস্থলে লেখা র খাতায় অন্যবিধ শব্দ মালা ফেনময় সমুদ্রের বুকে কৃষ্ণ মীনের ন্যায় ফুটে উঠতে লাগল"
.........................................................
মহাযান বৌদ্ধ মতে প্রত্যেকে বুদ্ধত্ব অর্জনের অধিকারী। এই অস্থির সময়ে সেই মহাকারুণিক কে আবার নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল এই বইটি।
নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা
লেখক:সন্মাত্রানন্দ
প্রকাশনা:ধানসিড়ি